January 30, 2015

মুরং
---------------
পার্বত্য চট্রগ্রামে তিনটি জেলা। বান্দরবন , খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি। এই তিন জেলার বিভিন্ন স্থানে মুরং জাতির বসবাস। এরা সচরাচর দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বাঁশ , ছন , বেত ও কাঠের ঘর তৈরী করে তাতে জীবন যাপন  করে। সভ্য ও আধুনিক সমাজ থেকে দূরে থাকতে তারা পছন্দ করে। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ বলেছেন , মুরং জাতির লোকজন অনেক আগে মায়ানমারের আরাকানে বসবাস করতো। অপর কোনো শক্তিধর জাতির তাড়া খেয়ে মুরংরা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পাঁচটি গোত্রে বিভক্ত মুরং জাতি। এগুলো হচ্ছে- দেন্গোয়া , কংলাই , সাইজার , প্রাসসাং ও গ্লারো গ্লনোর। মুরং সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। অবশ্য মেয়েদের প্রাধান্যও রয়েছে। এই অর্থে তাদের পরিবারকে যৌথ পরিবারই বলা যায়। ভাত ও মদ মুরংদের প্রধান খাদ্য। উন্নতমানের মদ তৈরিতে তারা সিদ্ধহস্ত। কুকুর , হরিণ , গরু , ছাগল , পাখি , শুকর , বাঘ প্রভৃতি প্রাণীর মাংসও তাদের প্রিয় খাদ্য। এরা- বাসী ভাত ,শুকর ,শুটকি , মাছ , ব্যঙ ও চর্বি দিয়ে নাম্পি নামক এক প্রকার খাবার তৈরি করে। বিশেষ ধরনের খাবার তৈরি করা হলে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। 
জুম চাষে অভ্যস্ত মুরং জাতি। এ থেকে সারা বছরের খাবার হয়ে যায় বলে , বাকী সময় আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকে। জুম চাষের জন্য হেডম্যানের অনুমতি ও কর বা খাজনা দিতে হয়। নারী পুরুষ উভয়েই জুম চাষে অংশ নেয়। প্রধান পেশা কৃষি ছাড়াও কাঠের জ্বাগলী , ঝুড়ি বোনা , বাড়িঘর তৈরি , শিকার করা ও মাছ ধরার কাজও করে। সন্তান প্রসবের সময় প্রসূতিকে কিমমা নামের বিশেষ ঘরে রাখা হয় নয় দিন। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে নাচ-গানের আয়োজন অনিবার্য। যুবক- যুবতীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নাচ বা গান করে। চার   ধরনের নাচের চল রয়েছে মুরং সমাজে। এগুলো হলো- প্লীচ , প্লীচিং চাত চেতপ্লী , দেংগরামতকপ্লী এবং রাওলাতাতিংগি। পরিবারের সবার বড় সন্তানের আগে অতপর ছোটদের বিয়ে হয়। অন্য গোত্রের মধ্যে বিয়ে হতে বাধা নেই। বিয়েতে পণ দেবার রীতি প্রচলিত আছে। তবে তা খুব সামান্য। মাত্র তিন'শ থেকে পাঁচ'শ টাকা। এই টাকা অবশ্য খরচ করা হয় বিয়ের আয়োজনেই। ওয়াংলাই মুরং মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। পুরুষরা এক টুকরো নেংটি এবং ইদানিং লুঙ্গিও পরিধান করে। কাপড়ের স্বল্পতার কারণে মেয়েরা নগ্ন ও নিরাভরণ থাকতে সংকোচ করে না। তবে যাদের সামর্থ রয়েছে তারা প্রসাধনী ও সাধারণ অলংকার ব্যবহার করে। এগুলো প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি। মুরংদের প্রধান দেবতা তুবাই । তারা বিশ্বাস করে তুবাই বিশ্ব সৃষ্টি ( করেছেন ) এবং ওরেং হলো গৃহদেবতা। তবে সুংতিয়াং নামে আরেক দেবতার ওপরও তাদের আস্থা আছে। এরা বৌদ্ধধর্ম অনুসারে পারলৌকিক জীবনে বিশ্বাস করে না। মৃত্যুর পর সাত দিন মৃতদেহ ঘরে রাখা হয়। এ ক'দিন তারা নানা ধরণের উত্সব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পশু বা প্রাণীর মাংস সহযোগে ভোজের আয়োজন করে। সাত দিন পর শ্মশানে নিয়ে মৃতদেহ পোড়ানো হয়। হাড়গোড় সংগ্রহ করে পুঁতে ফেলা হয় মাটিতে। উত্সবের আয়োজন করলেও কারো মৃত্যুর পর  বিলাপ করার রেওয়াজ নেই মুরং সমাজে।   

No comments:

Post a Comment