"জলবায়ু পরিবর্তন" (climate change)
এই অধ্যায়ে আপনারা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক নির্দেশনা পাবেন।
জলবায়ু পরিবর্তন কি?
এর কারণ কি?
এর জন্য মানুষ কিভাবে দায়ী?
আমাদের হাতে অতীত ও বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কিধরনের বাস্তব প্রমাণ রয়েছে?
দৃশ্যত আমাদের ভবিষ্যত কেমন হতে পারে?
জলবায়ু পরিবর্তন বলতে আমরা কি বুঝি?
জলবায়ু পরিবর্তন বলতে ৩০ বছর বা তার বেশি সময়ে জলবায়ুর উপাদান যেমন তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনকে বোঝায়। যদি সত্যি জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে থাকে তাহলে ৩০ বছরের গড় তাপমাত্রা, বা বৃষ্টিপাত অথবা রোদ্রোজ্জ্বল দিনের সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে।
আবহাওয়া এবং জলবায়ুকে খুব সহজেই মিলিয়ে ফেলা যায়।
এক্ষেত্রে সাধারণভাবে চিন্তা করার উপায় আছে: জলবায়ু হচ্ছে আমরা কি আশাকরি (যেমন: অত্যন্ত ঠান্ডা শীতকাল) এবং আবহাওয়া হচ্ছে আমরা কি দেখি (যেমন: বৃষ্টি)। আবহাওয়া হচ্ছে কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের (সর্বোচ্চ ৭ দিনের) বায়ুমন্ডলের অবস্থা যা সাধারণত ঠান্ডা, গরম, আর্দ্রতা, বাতাসের গতিবেগ, মেঘের অবস্থা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির অবস্থা বুঝায়। আর জলবায়ু হচ্ছে কোন অঞ্চলের আবহাওয়া বা বায়ুমন্ডলের উপাদানসমূহের দীর্ঘদিনের (কমপক্ষে ৩০ বছরের) গড়।
১৯০০ সাল থেকে পৃথিবীর জলবায়ু উত্তপ্ত হচ্ছে। তবে এই উষ্ণতা বৃদ্ধি পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে ঘটেনি বরং ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মাত্রায় তাপমাত্রার এই পরিবর্তন ঘটেছে।
সূর্য কি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী?
এটা সত্য যে, সূর্য থেকে আগত আলো ও তাপের তারতম্য বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। পৃথিবীর জলবায়ুর উপর সূর্য থেকে আগতশক্তি (মূলত আলো ও তাপ) এবং সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তনের একটি প্রভাব রয়েছে। আনুমানিক ৩০ লক্ষ বছর ধরে প্রাকৃতিক নিয়মেই বরফ যুগের আবির্ভাব ও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এসকল ঘটনা যে মিলানকোভিচ এর ন্যায় কক্ষপথের নিয়মিত তারতম্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই চক্রগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান কর্তৃক গৃহীত সৌরশক্তির মাত্রাতে পরিবর্তন আনে তবে গত ৫০ বছরে সৌরশক্তির পরিবর্তনের চেয়ে গ্রীণহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে অনেক বেশি।
বিগত ১০০ বছরে কি কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি এবং সূর্যরশ্মি থেকে নির্গত শক্তির পরিবর্তনের কারনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েছে । বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ্বে মূলত গ্রীণহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণেই উষ্ণতা বেড়েছে।
শিল্পকারখানা থেকে নিঃসরিত সালফেট কণা সৌর বিকিরণকে প্রতিফলিত করে এবং এর ফলে এটি জলবায়ুকে শীতল রাখতে ভূমিকা রাখে । এই কণিকা ১৯৪০ থেকে বেশ কিছু দশক পর্যন্ত উষ্ণতাকে আড়াল করে রাখতে সাহায্য করতো, কিন্তু এই বিষাক্ত পদার্থগুলোর কমে যাওয়ায় এবং সেই সাথে গ্রীণহাউজ গ্যাসের নিয়মিত ঘনত্ব বৃদ্ধিতে ১৯৭০ সাল থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নতুন করে বাড়িয়ে তোলে।
গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট কি?
বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাস সূর্যরশ্মির তাপ আটকে রেখে পৃথিবীকে উষ্ণ রাখে। এ ধরণের গ্যাসসমূহকে গ্রীণহাউজ গ্যাস বলে। গ্রীণহাউজ গ্যাসগুলোর প্রভাবেই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বসবাসযোগ্য পর্যায়ে এসেছে। তা না হলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দাঁড়াত ও হিমাঙ্কের নিচে ১৭ ডিগ্রি সেঃ বা তারও কম।
পৃথিবীর তাপমাত্রা নির্ধারিত হয় সূর্য থেকে আগত দৃশ্যমান আলোকরশ্মির বিকিরণ শক্তি এবং ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে ধারাবাহিকভাবে নিঃসরিত নিম্নশক্তির অদৃশ্য তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আকারে তাপশক্তি হিসেবে মহাশূণ্যে ফিরে যাওয়ার মধ্যকার ভারসাম্যের উপর।
সূর্য থেকে আগত শক্তি মোটামুটি অপরিবর্তিতভাবে স্বচছ বায়ুমন্ডলকে ভালভাবে ভেদ করে এবং ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগকে উত্তপ্ত করে। বায়ুমন্ডলের কিছু গ্যাস ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে আগত নিম্ন শক্তির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের অংশবিশেষকে ধরে রাখে এবং এর কিছু অংশ নিচের দিকে পুনরায় বিকিরিত হতে থাকে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ এবং বায়ুমন্ডলের নিচের অংশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। একেই গ্রীণহাউজ প্রতিক্রিয়া বলে।
প্রাথমিকভাবে বায়ুমন্ডলে তাপ শোষণকারী গ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে জলীয়বাষ্প (দুই-তৃতীয়াংশ ইফেক্টের জন্য দায়ী) এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড। মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ওজোন এবং অন্যান্য গ্যাসগুলো বায়ুমন্ডলে স্বল্পমাত্রায় রয়েছে যা গ্রীণহাউজ ইফেক্টে ভূমিকা রাখে। গ্রীণহাউজ ইফেক্ট ছাড়া পৃথিবী বর্তমানের তুলনায় গড়ে ৩৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস শীতল থাকতো।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আর কি দায়ী হতে পারে?
আগ্নেয়গিরির উদগিরণ নিশ্চিতভাবে বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। বিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে এরূপ তিনটি বড় বড় উদগিরণ হয়েছে - ইন্দেনেশিয়ার আগাং (১৯৬৩), মেক্সিকোর এলচিখোন (১৯৮২) এবং ফিলিপিনসের পিনাতুবো (১৯৯১) তে।
আগ্নেযগিরির প্রবল উদগিরণ থেকে নির্গত পদার্থকণা (অংশবিশেষ) মেঘমালার সবচেয়ে উঁচু স্তরে এবং স্ট্রেটোস্ফিয়ার স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যেখানে এগুলো সূর্য থেকে আগত সৌরশক্তির প্রতিফলনের পরিমানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। আগ্নেয়গিরির প্রবল উদগিরণ কখনও বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে মাস খানিকের জন্য অথবা কয়েক বছরের জন্য ০.৫ ডিগ্রী সেঃ এর মত হ্রাস করতে পারে।
যাইহোক শুধুমাত্র আগ্নেয়গিরির উদগিরণই জলবায়ুকে প্রভাবিত করে না। পৃথিবীতে শক্তির বিকিরণের ভারসাম্য পরিবর্তনের তিনটি উপায় আছে:
১. সূর্য থেকে আগত শক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে, উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন বা সূর্যের নিজস্ব কোন পরিবর্তন,
২. সৌর বিকিরণের যে অংশ প্রতিফলিত হয় তার পরিবর্তনের মাধ্যমে উদাহরণস্বরূপ, মেঘের আবরণ, উদ্ভিদসমূহ (মেঘের স্তর, ভূপৃষ্ঠের সবুজ আচ্ছাদন) বা বায়ুমমণ্ডলে উপস্থিত কণিকার পরিবর্তন; যেমন: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুতপাত থেকে নির্গত পদার্থ সমূহ বা সালফেট এরোসল,
৩. গ্রীণহাউজ গ্যাসের ঘনত্বের পরিবর্তন, উদাহরণস্বরূপ, শিল্পবিপ্লবের যুগে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান ৩৫% এর মত বৃদ্ধি পায়, এবং অতি পরিচিত মানব কর্মকান্ডের ফলে এই বৃদ্ধি ঘটে, প্রাথমিকভাবে এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং বনভূমি উজাড়।
কিভাবে গ্রীণ হাউজ প্রতিক্রিয়ার ফলে জলবায়ু পরিবর্তিত হয়েছে?
আমাদের বায়ুমন্ডলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গ্যাস যেমন: কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং মিথেনের এক ধরনের তাপ ধারণক্ষম প্রভাব রয়েছে, যা ছাড়া আমাদের পৃথিবী হয়তো বরফ আচ্ছাদিত হয়ে থাকতো। তবে বায়ুমন্ডলে গ্রীণহাউজ গ্যাসের মাত্রা বেড়ে গিয়ে মহাশূণ্যে তাপ নির্গমনে বাধার সৃষ্টি করছে যার ফলাফল হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
যখন বায়ুমন্ডলে গ্রীণহাউজ গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই মহাশূণ্যে তাপের বিকিরণ কমে যায় এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যায়- যা “বৈশ্বিক উষ্ণায়ন'' হিসেবে পরিচিত।
গত দেড়শ বছরে শিল্পবিপ্লবের সূচনা লগ্ন থেকে মানুষের কর্মকান্ডই মূলত, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, এবং নাইট্রাস অক্সাইড এই তিনটি প্রধান গ্রীণহাউজ গ্যাসের নির্গমন বাড়িয়েছে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের বায়ুমন্ডলে এই গ্যাসগুলো জমে জমে ঘনত্ব বাড়িয়ে তুলছে।
কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂)
পরিবহন, শক্তি, দালানকোঠা শীতলীকরণ ইত্যাদি কাজের জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কার্বন-ডাই-অক্সাইডের (CO₂) নির্গমন বাড়িয়ে দেয়। বনউজাড় এর ফলেও কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়ে কারণ এতে গাছপালা দ্বারা কার্বন শোষণ কমে যায়।
মিথেন (CH₄)
কৃষি, প্রাকৃতিক গ্যাসের বন্টন এবং ল্যান্ডফিলের সাথে সম্পৃক্ত মানুষের কর্মকান্ড মিথেনের (CH₄)
নির্গমন দ্বিগুন করেছে। নিমজ্জিত ধানক্ষেত এবং গবাদি পশু বিশেষত গরু ও মহিষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথেও মিথেন গ্যাস নির্গত হয়।
নাইট্রাস অক্সাইড
সার ব্যবহার এবং জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের মত মনুষ্য কর্মকান্ডের দরুণ নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন ঘটে।
আরও যা জানা উচিত
বায়ুমন্ডলের নিম্নস্তরে আরও কিছু গ্যাস যেমন: সিএফসি (যেগুলোর নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে কমছে) এবং ওজোন রয়েছে, যেগুলো “গ্রীণহাউজ প্রতিক্রিয়ায়” অংশগ্রহণ করে।
জলীয়বাষ্প বায়ুমন্ডলে পরিমাণে সর্বাধিক এবং অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ একটি গ্রীণহাউজ গ্যাস। তবে বায়ুমন্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণের উপর মানুষের কর্মকান্ড খুবই সামান্য প্রভাব রাখে। পরোক্ষভাবে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে কারণ উষ্ণ বায়ুমন্ডল অধিক জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে।
এ্যারোসল হল বিভিন্ন আকারের ঘনত্বের ও রাসায়নিক গঠনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কণিকা যা বায়ুমন্ডলে অবস্থান করে। জীবাশ্ম জ্বালানী এবং জৈব বস্তু দহন সালফার, জৈব যৌগ এবং কালো কার্বনে সমৃদ্ধ এরোসলের বৃদ্ধি ঘটায়।
.....................




পরবর্তী আলোচনা....
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-
এই অধ্যায়ে আপনারা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক নির্দেশনা পাবেন।
জলবায়ু পরিবর্তন কি?
এর কারণ কি?
এর জন্য মানুষ কিভাবে দায়ী?
আমাদের হাতে অতীত ও বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কিধরনের বাস্তব প্রমাণ রয়েছে?
দৃশ্যত আমাদের ভবিষ্যত কেমন হতে পারে?
জলবায়ু পরিবর্তন বলতে আমরা কি বুঝি?
জলবায়ু পরিবর্তন বলতে ৩০ বছর বা তার বেশি সময়ে জলবায়ুর উপাদান যেমন তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনকে বোঝায়। যদি সত্যি জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে থাকে তাহলে ৩০ বছরের গড় তাপমাত্রা, বা বৃষ্টিপাত অথবা রোদ্রোজ্জ্বল দিনের সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে।
আবহাওয়া এবং জলবায়ুকে খুব সহজেই মিলিয়ে ফেলা যায়।
এক্ষেত্রে সাধারণভাবে চিন্তা করার উপায় আছে: জলবায়ু হচ্ছে আমরা কি আশাকরি (যেমন: অত্যন্ত ঠান্ডা শীতকাল) এবং আবহাওয়া হচ্ছে আমরা কি দেখি (যেমন: বৃষ্টি)। আবহাওয়া হচ্ছে কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের (সর্বোচ্চ ৭ দিনের) বায়ুমন্ডলের অবস্থা যা সাধারণত ঠান্ডা, গরম, আর্দ্রতা, বাতাসের গতিবেগ, মেঘের অবস্থা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির অবস্থা বুঝায়। আর জলবায়ু হচ্ছে কোন অঞ্চলের আবহাওয়া বা বায়ুমন্ডলের উপাদানসমূহের দীর্ঘদিনের (কমপক্ষে ৩০ বছরের) গড়।
১৯০০ সাল থেকে পৃথিবীর জলবায়ু উত্তপ্ত হচ্ছে। তবে এই উষ্ণতা বৃদ্ধি পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে ঘটেনি বরং ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মাত্রায় তাপমাত্রার এই পরিবর্তন ঘটেছে।
সূর্য কি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী?
এটা সত্য যে, সূর্য থেকে আগত আলো ও তাপের তারতম্য বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। পৃথিবীর জলবায়ুর উপর সূর্য থেকে আগতশক্তি (মূলত আলো ও তাপ) এবং সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তনের একটি প্রভাব রয়েছে। আনুমানিক ৩০ লক্ষ বছর ধরে প্রাকৃতিক নিয়মেই বরফ যুগের আবির্ভাব ও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এসকল ঘটনা যে মিলানকোভিচ এর ন্যায় কক্ষপথের নিয়মিত তারতম্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই চক্রগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান কর্তৃক গৃহীত সৌরশক্তির মাত্রাতে পরিবর্তন আনে তবে গত ৫০ বছরে সৌরশক্তির পরিবর্তনের চেয়ে গ্রীণহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে অনেক বেশি।
বিগত ১০০ বছরে কি কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি এবং সূর্যরশ্মি থেকে নির্গত শক্তির পরিবর্তনের কারনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েছে । বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ্বে মূলত গ্রীণহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণেই উষ্ণতা বেড়েছে।
শিল্পকারখানা থেকে নিঃসরিত সালফেট কণা সৌর বিকিরণকে প্রতিফলিত করে এবং এর ফলে এটি জলবায়ুকে শীতল রাখতে ভূমিকা রাখে । এই কণিকা ১৯৪০ থেকে বেশ কিছু দশক পর্যন্ত উষ্ণতাকে আড়াল করে রাখতে সাহায্য করতো, কিন্তু এই বিষাক্ত পদার্থগুলোর কমে যাওয়ায় এবং সেই সাথে গ্রীণহাউজ গ্যাসের নিয়মিত ঘনত্ব বৃদ্ধিতে ১৯৭০ সাল থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নতুন করে বাড়িয়ে তোলে।
গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট কি?
বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাস সূর্যরশ্মির তাপ আটকে রেখে পৃথিবীকে উষ্ণ রাখে। এ ধরণের গ্যাসসমূহকে গ্রীণহাউজ গ্যাস বলে। গ্রীণহাউজ গ্যাসগুলোর প্রভাবেই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বসবাসযোগ্য পর্যায়ে এসেছে। তা না হলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দাঁড়াত ও হিমাঙ্কের নিচে ১৭ ডিগ্রি সেঃ বা তারও কম।
পৃথিবীর তাপমাত্রা নির্ধারিত হয় সূর্য থেকে আগত দৃশ্যমান আলোকরশ্মির বিকিরণ শক্তি এবং ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে ধারাবাহিকভাবে নিঃসরিত নিম্নশক্তির অদৃশ্য তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আকারে তাপশক্তি হিসেবে মহাশূণ্যে ফিরে যাওয়ার মধ্যকার ভারসাম্যের উপর।
সূর্য থেকে আগত শক্তি মোটামুটি অপরিবর্তিতভাবে স্বচছ বায়ুমন্ডলকে ভালভাবে ভেদ করে এবং ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগকে উত্তপ্ত করে। বায়ুমন্ডলের কিছু গ্যাস ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে আগত নিম্ন শক্তির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের অংশবিশেষকে ধরে রাখে এবং এর কিছু অংশ নিচের দিকে পুনরায় বিকিরিত হতে থাকে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ এবং বায়ুমন্ডলের নিচের অংশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। একেই গ্রীণহাউজ প্রতিক্রিয়া বলে।
প্রাথমিকভাবে বায়ুমন্ডলে তাপ শোষণকারী গ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে জলীয়বাষ্প (দুই-তৃতীয়াংশ ইফেক্টের জন্য দায়ী) এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড। মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ওজোন এবং অন্যান্য গ্যাসগুলো বায়ুমন্ডলে স্বল্পমাত্রায় রয়েছে যা গ্রীণহাউজ ইফেক্টে ভূমিকা রাখে। গ্রীণহাউজ ইফেক্ট ছাড়া পৃথিবী বর্তমানের তুলনায় গড়ে ৩৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস শীতল থাকতো।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আর কি দায়ী হতে পারে?
আগ্নেয়গিরির উদগিরণ নিশ্চিতভাবে বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। বিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে এরূপ তিনটি বড় বড় উদগিরণ হয়েছে - ইন্দেনেশিয়ার আগাং (১৯৬৩), মেক্সিকোর এলচিখোন (১৯৮২) এবং ফিলিপিনসের পিনাতুবো (১৯৯১) তে।
আগ্নেযগিরির প্রবল উদগিরণ থেকে নির্গত পদার্থকণা (অংশবিশেষ) মেঘমালার সবচেয়ে উঁচু স্তরে এবং স্ট্রেটোস্ফিয়ার স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যেখানে এগুলো সূর্য থেকে আগত সৌরশক্তির প্রতিফলনের পরিমানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। আগ্নেয়গিরির প্রবল উদগিরণ কখনও বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে মাস খানিকের জন্য অথবা কয়েক বছরের জন্য ০.৫ ডিগ্রী সেঃ এর মত হ্রাস করতে পারে।
যাইহোক শুধুমাত্র আগ্নেয়গিরির উদগিরণই জলবায়ুকে প্রভাবিত করে না। পৃথিবীতে শক্তির বিকিরণের ভারসাম্য পরিবর্তনের তিনটি উপায় আছে:
১. সূর্য থেকে আগত শক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে, উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন বা সূর্যের নিজস্ব কোন পরিবর্তন,
২. সৌর বিকিরণের যে অংশ প্রতিফলিত হয় তার পরিবর্তনের মাধ্যমে উদাহরণস্বরূপ, মেঘের আবরণ, উদ্ভিদসমূহ (মেঘের স্তর, ভূপৃষ্ঠের সবুজ আচ্ছাদন) বা বায়ুমমণ্ডলে উপস্থিত কণিকার পরিবর্তন; যেমন: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুতপাত থেকে নির্গত পদার্থ সমূহ বা সালফেট এরোসল,
৩. গ্রীণহাউজ গ্যাসের ঘনত্বের পরিবর্তন, উদাহরণস্বরূপ, শিল্পবিপ্লবের যুগে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান ৩৫% এর মত বৃদ্ধি পায়, এবং অতি পরিচিত মানব কর্মকান্ডের ফলে এই বৃদ্ধি ঘটে, প্রাথমিকভাবে এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং বনভূমি উজাড়।
কিভাবে গ্রীণ হাউজ প্রতিক্রিয়ার ফলে জলবায়ু পরিবর্তিত হয়েছে?
আমাদের বায়ুমন্ডলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গ্যাস যেমন: কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং মিথেনের এক ধরনের তাপ ধারণক্ষম প্রভাব রয়েছে, যা ছাড়া আমাদের পৃথিবী হয়তো বরফ আচ্ছাদিত হয়ে থাকতো। তবে বায়ুমন্ডলে গ্রীণহাউজ গ্যাসের মাত্রা বেড়ে গিয়ে মহাশূণ্যে তাপ নির্গমনে বাধার সৃষ্টি করছে যার ফলাফল হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
যখন বায়ুমন্ডলে গ্রীণহাউজ গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই মহাশূণ্যে তাপের বিকিরণ কমে যায় এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যায়- যা “বৈশ্বিক উষ্ণায়ন'' হিসেবে পরিচিত।
গত দেড়শ বছরে শিল্পবিপ্লবের সূচনা লগ্ন থেকে মানুষের কর্মকান্ডই মূলত, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, এবং নাইট্রাস অক্সাইড এই তিনটি প্রধান গ্রীণহাউজ গ্যাসের নির্গমন বাড়িয়েছে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের বায়ুমন্ডলে এই গ্যাসগুলো জমে জমে ঘনত্ব বাড়িয়ে তুলছে।
কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂)
পরিবহন, শক্তি, দালানকোঠা শীতলীকরণ ইত্যাদি কাজের জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কার্বন-ডাই-অক্সাইডের (CO₂) নির্গমন বাড়িয়ে দেয়। বনউজাড় এর ফলেও কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়ে কারণ এতে গাছপালা দ্বারা কার্বন শোষণ কমে যায়।
মিথেন (CH₄)
কৃষি, প্রাকৃতিক গ্যাসের বন্টন এবং ল্যান্ডফিলের সাথে সম্পৃক্ত মানুষের কর্মকান্ড মিথেনের (CH₄)
নির্গমন দ্বিগুন করেছে। নিমজ্জিত ধানক্ষেত এবং গবাদি পশু বিশেষত গরু ও মহিষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথেও মিথেন গ্যাস নির্গত হয়।
নাইট্রাস অক্সাইড
সার ব্যবহার এবং জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের মত মনুষ্য কর্মকান্ডের দরুণ নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন ঘটে।
আরও যা জানা উচিত
বায়ুমন্ডলের নিম্নস্তরে আরও কিছু গ্যাস যেমন: সিএফসি (যেগুলোর নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে কমছে) এবং ওজোন রয়েছে, যেগুলো “গ্রীণহাউজ প্রতিক্রিয়ায়” অংশগ্রহণ করে।
জলীয়বাষ্প বায়ুমন্ডলে পরিমাণে সর্বাধিক এবং অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ একটি গ্রীণহাউজ গ্যাস। তবে বায়ুমন্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণের উপর মানুষের কর্মকান্ড খুবই সামান্য প্রভাব রাখে। পরোক্ষভাবে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে কারণ উষ্ণ বায়ুমন্ডল অধিক জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে।
এ্যারোসল হল বিভিন্ন আকারের ঘনত্বের ও রাসায়নিক গঠনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কণিকা যা বায়ুমন্ডলে অবস্থান করে। জীবাশ্ম জ্বালানী এবং জৈব বস্তু দহন সালফার, জৈব যৌগ এবং কালো কার্বনে সমৃদ্ধ এরোসলের বৃদ্ধি ঘটায়।
.....................
পরবর্তী আলোচনা....
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-
No comments:
Post a Comment