August 8, 2014

সুলতানা পারভীন 
(টেপু কাহিনী- গল্প নয় সত্যি)
টেপু'র কুয়োস্নান 
-------------
আমাদের কাজের ছেলে টেপু-২ ফুট ৯ ইঞ্চি-র এই পিচ্চি...
হেনো কাজ নেই যা সে পারে না কথায় কাজে চলনে বলনে বড়ই চৌকস 
কোনো কিছুতেই হার মানতে জানে না- একদিন গরু'র লেজ ধরে টান মেরে... 
খেলো এক রাম লাত্থ...এদিক ওদিক লজ্জিত চোখে চেয়ে দেখলো, 
কেউ দেখতে পায়নি তো ! যেখানে বাঘের ভয়....সেখানেই সন্ধ্যা হয়...
বুয়া দিচ্ছিলো ঝাড়ু- দেখে ফেললো টেপু'র দুর্দশা হি হি করে হেসে বললো... 
কি রে টেপু কেমন খেলি ? হার মানবার পাত্র আর যে-ই হোক টেপু নয় 
বুক চিতিয়ে বললো... দূর দূর দেখছিলাম- গরু'টা সরস নাকি নিরস হে হে হে 
আমাদের বাড়ি থেকে টেপু'র বাড়ি ২০০ গজ দুরে ওদের ছিলো একটা কূয়া 
পোড়া মাটির রিঙ দিয়ে ঘেরা- গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে পাটকুয়া...
ওর মা ভাই-বোন্ ভাবি সবাই ঐ পাট কুয়ার পানি-ই খেতো 
টেপুর একটা অভ্যেস ছিলো...কুয়োর মধ্যে মাথা ঝুকিয়ে নানা রকম শব্দ করা... 
কুয়োর গভীরে যে প্রতিধ্বনি হতো...সেটা সে ভীষণ উপভোগ করতো 
কখনোই কারো নিষেধে কর্ণপাত করতো না...
প্রচন্ড শীত কাল একদিন সন্ধ্যায়... বাড়িতে টেপুর 
ভাবি ছাড়া আর কেউ নেই...টেপু আমাদের বাড়ির 
সব কাজ গুছিয়ে রেখে কাউকে কিছু না বলে ওদের 
বাড়িতে গেছে...সন্ধ্যার আধো আলো আঁধারে কুয়োর 
মধ্যে মাথা ঝুকিয়ে যথা নিয়মে নানা রকম শব্দ করছে,
আর অনেক নিচে অন্ধকারে কালো পানিতে নিজের ছায়া 
দেখে ভীষণ পুলোকিত... আনন্দের  আতিশজ্যে একটু বেশি-ই 
ঝুকে পড়েছিলো হয়তো... আর যায় কোথায়...অমনিই ধপাস-
ওর ভাবি পড়ছিলো নামাজ...শব্দ শুনে চমকে উঠে কোনো 
রকমে ফরজ নানাজ আদায় করেই দৌড়ে গেলো কুয়োর পাড়ে 
আগেই বুঝে ফেলেছিলো কি ঘটেছে...কুয়োর ভেতরে তাকিয়ে 
দেখে টেপু এই প্রচন্ড শীতে কুয়োর হিম শীতল পানিতে পোড়া 
মাটির রিঙ ধরে ভেসে আছে আর ঠক ঠক করে কাঁপছে 
ভাবিকে উপরে দেখতে পেয়ে টেপু চিত্কার করে বললো...
ভাবি-ই-ই-ই আমাকে উপরে তোলো......জমে গেলাম...
ভাবি সমানে চিত্কার শুরু করে দিলো...কে কোথায় আছ 
জলদি আসো আমাদের টেপু কুয়ায় পড়ে গেছে...ওরে বাঁচাও 
গ্রামের বাজার ফেরত কিছু মানুষ ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে 
যাচ্ছিলো চিত্কার শুনে সবাই দৌড়ে এলো... কিন্তু ততক্ষণে 
আঁধার অনেক ঘন হয়ে আসায়... কুয়ায় নামতে কেউ সাহস
পাচ্ছিলো না- সবাই ভীড় করে উঁকি ঝুকি মেরে দেখার চেষ্টা 
করছিলো- আর একে অন্যকে কিভাবে নামতে হবে সেই পরামর্শই 
দিচ্ছে...ওদিকে টেপুর অবস্থা আরো শোচনীয়...সে বলছে... 
কেউ একজন নামো রে ভাই... এখানে ভয়ের কিছু নাই... আমি 
তো আছি...এদিকে ভাবি কেঁদে কেঁদে সবাইকে অনুরোধ করে চলেছে 
টেপূকে তুলে দাও... কেউ একজন ওকে তুলে দাও...
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন সাহসী মানুষ এগিয়ে এলো... 
অনেক পুরনো পোড়া মাটির রিঙ...পূর্ণ বয়স্ক একজন মানুষের 
ভারে ভেঙ্গে পড়তে পারে... কি ভাবে কি করা যায়...এই নিয়ে চললো 
গবেষণা...আমি সেই ভিড়ের মাঝ থেকে বেরিয়ে...ভো দৌড়...
আমাদের গরু'র যতো রশি ছিলো সব নিয়ে এলাম...সেই সাহসী মানুষ'টার 
কোমরে বেঁধে নামিয়ে দেওয়া হলো... টেপু- বিখ্যাত টেপু দাঁতে-দাঁতে ঠোক্কর 
 খেতে খেতে কুচকুচে কালো চেহারার দিগ্বিজয়ী টেপু আরও কালো হয়ে 
উঠে এলো... তাকে রুটি সেঁকা করতে জ্বালানো হলো আগুন...সকলের-ই 
হৈ চৈ জিজ্ঞাসা- কি রে টেপু কেমন করে পড়লি কুয়ায় ? কেন গিয়েছিলি 
কুয়ার ধারে ? পানি খুব ঠান্ডা ছিলো ? ভয় পেয়েছিলি ? কি মনে হচ্ছিলো 
তোর্ ? টেপু'র তখন ঠোঁট টেপানো রহস্যময় মুচকি হাসি...টেপুর মায়ের 
চোখে জল মুখে কপট গজগজানি কেন তোমরা তুললে ওকে... থাকতো পড়ে 
বুঝতো মজা... কতো বারণ করেছি...কুয়ার ধারে যাইস না আজ কি হলো ?
মরতি... ভালো হতো...হাড় জুড়াতো আমার- টেপু হাসে হি হি করে... 
আমি বললাম হ্যা রে টেপু সত্যি করে বল তো তুই পড়লি কি করে ? 
কালো টেপু সব গুলো সাদা দাঁত বের করে বললো... আপা- আমি পড়ি নাই তো...
অবাক হয়ে বললাম...পড়িসনি !! টেপু'র চটপট জবাব... না আপা-
আমি পড়ি নাই ঝাঁপ দিছি...সমস্বরে অবাক প্রশ্ন- বলিস কি রে ? কেন ?
এপাস ওপাস মাথা দুলিয়ে গম্ভীর হয়ে টেপু বললো...কেন ? নাহ বলা 
যাবে না- বললে তোমরা বিশ্বাস করবে না- টেপুর ভনিতা দেখে মেজাজ 
বিগড়ে গেল আমার... ওর  কান'টা টেনে ধরে বললাম বলতে হবে না 
তোকে- কেউ শুনবে না তোর্ কথা... টেপু'র চিত্কার ও-ও-ওহ ছাড়ো 
আপা ছাড়ো লাগছে তো...বলছি বলছি...কান ছেড়ে দিলাম...
সে আরাম করে বসলোবেশ সময় নিয়ে প্রায় ফিস ফিস করে বললো...
"আমি কুয়া'টার পানি কত টুকু আছে তাই মাপতে গেছিলাম"...
আবার সমস্বরে অবাক প্রশ্ন কেন ?পানি মাপা'র দরকার হলো কেন ? 
টেপু বিজ্ঞের মতো মাথা দুলিয়ে বলল.......
"আসছে চৈত মাসে পানি থাকবে কি না- কুয়া'টা আবার খুঁড়তে হবে কি না 
এটা জানতে হবে না" !! আর সহ্য হলো না আমার...ঠাস করে একটা চড় মেরে 
ওর কান ধরে সোজা হিড়্ হিড়্ করে টেনে নিয়ে চললাম বাড়ি... 
গোয়ালের সব গরু ততক্ষণে বেরিয়ে এসে... লাউ-কুমড়া-সিম-বরবটির গাছ 
সাবাড় করে দিয়েছে...আমার নিজের তখন ভয়ে- দোআ দরূদ পড়ার অবস্থা- !!
    
     

No comments:

Post a Comment